ঢাকাSaturday , 3 August 2019
  1. Correspondent
  2. English News
  3. আজকের ময়মনসিংহ
  4. আদালত
  5. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  6. ইসলাম ও জীবন
  7. এক্সক্লুসিভ ময়মনসিংহ
  8. করোনা আপডেট
  9. করোনায় সহযোগীতা
  10. খেলার সংবাদ
  11. চাকুরী
  12. ছবি গ্যালারী
  13. জাতীয় অহংকার
  14. জাতীয় নির্বাচন ২০১৮
  15. জাতীয় সংবাদ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আমার মা, আমার দেশ

Link Copied!

২৫ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার ঘুম থেকে উঠেই আমার কাছে এলো তাহিয়া (আমার মেয়ে, বয়স ছয় বছর চলছে), বলল- ‘আজ ২৫ জুলাই আম্মুর জন্মদিন’।

বললাম, ‘উত্তম হোক তোমার মায়ের জন্মদিন, তার মৃত্যুর দিন এবং উত্তম হোক তার কিয়ামতের দিনগুলো’- এটি পবিত্র কুরআন শরিফের দোয়া। ওর মাকে রসিকতা করে জিজ্ঞাসা করলাম ‘আজ তোমার কততম জন্মদিন?’ সে ‘টেকনিক্যালি’ বলল, ‘তোমার চেয়ে ১০ বছর কম’।

ঠিক কবে আমার জন্ম তা জানি না তবে এটা জানি, আমার জন্মদিন আর আমার মায়ের মৃত্যু দিন একই। যেদিন এ পৃথিবীতে এসেছি, সেদিনই মা এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বলা যায়, আমার জন্মই তার মৃত্যুর অছিলা। শুনেছি দুপুর ১২টার দিকে আমার জন্ম আর বিকেল ৪টার দিকে আমার মায়ের ওফাত। মায়ের নাড়ি ছিঁড়ে ভূমিষ্ঠ হলাম আর এ নাড়ি ছেঁড়ার যন্ত্রণায় মা শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করলেন- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমার আগমন আর তার প্রস্থান একই সূত্রে গাঁথা, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস।

যখন কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে, তখন পরিবার-পরিজনের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয় শিশুটির মা, মাতৃত্বের পরিচয় নিয়ে যে গর্ববোধ করে। পরিবারের সবাই সুখানুভব করে, শিশুকে নিয়ে সবাই আদর করে, চুমু খায়, তাকে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে, নাম রাখা নিয়ে চলে আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। মিষ্টি নিয়ে আত্মীয়স্বজন আসে নবজাতককে দেখতে, দোয়া করতে আর তাকে নিয়ে সবাই স্বপ্ন দেখে। সব মিলিয়ে সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে চলে এক প্রীতিময় মহোৎসব যা দেখে মা পুলকিত হয়, তার গর্ভধারণের সব কষ্ট ভুলে যায়। ব্যতিক্রম আমার বেলায়, কারণ নিশ্চয়ই আমার ক্ষেত্রে এরূপ কিছু হয়নি। আমার পাশেই আমার মৃত মা শুয়েছিলেন। তার প্রাণটা আমাকে সপে দিয়ে নিজেই নিশ্চুপ হয়ে গেলেন- আজব এক ফায়সালা আল্লাহ তালার। সবাই তখন আমার পরিবর্তে আমার মাকে নিয়ে ব্যস্ত এবং শোকবিহ্বল, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। নিশ্চয়ই আমার মাকে নিয়ে কান্নাকাটি করেছে, আত্মীয় স্বজনকে জানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে গেছে, কেউ কেউ ব্যস্ত ছিল মায়ের দাফন কাফন নিয়ে, কেউ বা আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

হয়তো আমার মা জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ‘আমার কী সন্তান হয়েছে, ছেলে না মেয়ে?’ নিশ্চয়ই আমার দিকে একনজর তাকিয়েছিলেন, আমাকে বুকে নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, মাতৃত্বের স্বাদ অনুভব করার চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রসবকালীন যন্ত্রণা একপর্যায়ে খুব বেড়ে যায়, এলাকার একজন ডাক্তার ডাকা হলো। শুনেছি, একটা ইনজেকশন পুশ করার সাথে সাথেই আমার মায়ের অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি আমাকে একাকী রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন।

মায়ের পছন্দের নাম ছিল- ছেলে হলে শাহজাহান আর মেয়ে হলে শাহনাজ। মায়ের পছন্দের নামে সবাই আমাকে ডাকে, এটাই আমার মায়ের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি। মা তার নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে আমাকে এ পৃথিবী উপহার দিয়েছেন, পেয়েছি আলো বাতাস, অসংখ্য নিয়ামত- সবকিছুই আমার মায়ের প্রাণের বিনিময়ে কেনা, অনেক অনেক মূল্যবান। তাই আমি পৃথিবীর সব মায়ের মাঝে আমার মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। পৃথিবীর সব মাকে আমার সালাম, ভালোবাসা আর সীমাহীন শ্রদ্ধা।

দয়াময় আল্লাহপাক, বান্দার জন্য তার করুণার শেষ নেই। আমার মা যখন মারা যান, তখন আমি মাত্র চার ঘণ্টা বয়সের শিশু আর আমার নানীর (মরহুমা আবিলা খাতুন) কোলে আমার খালা নুরজাহান যার বয়স তখন মাত্র ২১ দিন। নানীর দুধ পান শুরু করলাম, তিনি অনেক কষ্ট করে আমাদের দুজনকে একসাথে লালন পালন করলেন। আমার নানা (মরহুম খোদাবকস বিশ^াস) ছিলেন বিচক্ষণ ব্যক্তি। তৎকালীন খাদিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, এলাকার সব মানুষের পরম বন্ধু। তার একক অভিভাবকত্বে কঠোর অনুশাসনের মধ্যে ক্রমেই বেড়ে উঠি। নানার পরিবার ছিল অনেক বড় বনেদি ১৪ জন সন্তান-সন্ততি, পুত্রবধূ, জামাই, নাতি-নাতনী, কৃষাণ- কৃষাণী ও রাখাল। সব মিলিয়ে প্রতিবেলায় রান্না হতো প্রায় ৪০ জনের। সেই সময়ে চাষাবাদই ছিল গ্রামীণ জীবনের মূল উপজীব্য।

প্রায় প্রতিদিন ১০-১৫ জন শ্রমিক (মুনিষ) কাজ করত। গরুর গোয়াল, খোঁয়াড়, পুকুর বাগান, সবজির বেড়া ইত্যাদি মিলে ছিল আমাদের ‘চেয়ারম্যান বাড়ি’। এ বাড়িতেই সবার আদর স্নেহে বেড়ে উঠলাম। নানা-নানীসহ এ বাড়ির সবাইকে আমি ভালোবাসি, অকৃত্রিম ভালোবাসা। আল্লাহ তোমাকে হাজারো শুকরিয়া। নানার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে স্কুলজীবন শেষ করে ভর্তি হলাম যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে যা ছিল এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক বিশাল স্বপ্ন। প্রাইমারি এবং জুনিয়র স্কলারশিপ পেলাম, এসএসসিতে সাতটা লেটার নিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলাতে প্রথম হলাম। ইংরেজিতে আমি আলাদা আলাদাভাবে লেটার পেলাম যা ছিল এলাকার একটা রেকর্ড।

এ উপলক্ষে স্কুল কর্তৃপক্ষ সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। জেলা প্রশাসক আমার হাতে তুলে দিলেন উপহার- কলম, বইসহ অনেক কিছু। বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি স্কুলের পক্ষ থেকে। এতে জেলাপর্যায়ে বিজয়ী হয়ে বিভাগীয়পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছি। জীবনে কোথাও হারিনি, হারব না ইনশাআল্লাহ। কারণ আমার জন্য আছে আমার মায়ের ভালোবাসা, নানা-নানীর দোয়া, শিক্ষকমণ্ডলীর সুশিক্ষা, গ্রামের মানুষের স্নেহ আর ভালোবাসা।

কলেজ জীবন শেষ করে ভর্তি হলাম বুয়েটে ১৯৯৪ সালে। খুব স্বল্পসংখ্যক ছাত্রই এ ক্যাম্পাসে ঢোকার সুযোগ পায়। সৌভাগ্যক্রমে আমি হলাম এ বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতক- যন্ত্রপ্রকৌশলী। এখান থেকে বের হয়ে শুরু করলাম কর্মজীবন, এখনো চলছে। চলবে দেশকে এগিয়ে নেয়ার এ সংগ্রাম। দুর্নীতি, পরাজয়, স্বার্থপরতা, ভোগ-বিলাসিতা, কর্মহীনতার করাল গ্রাস থেকে মায়ের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া মাতৃভূমি বাংলাদেশকে গড়তে চাই সবাই মিলে।

অনেক বন্ধুর মতো আমিও চেষ্টা করলে বিদেশ চলে যেতে হয়তো পারতাম। হয়তো সরকারি চাকরি করতে পারতাম, এসবের সুযোগও ছিল। কিন্তু প্রথম থেকেই এগুলো অপছন্দ করেছি। চেয়েছি, দেশেই থাকব, দেশের জন্য স্বাধীনভাবে কিছু করব। মৃত্যুর পর মায়ের কবরের পাশে আমার কবর হবে- দুজনা পাশাপাশি থাকব। উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই এখনো করতে পারিনি। তবে চেষ্টা করছি, বিশ^াস করি- পারব, ইনশা আল্লাহ।

অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল গ্রামের যুবসমাজের জন্য একটি টেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। এ বছর স্কুল চালু করতে পেরেছি। স্কুলের নাম ‘জহুরা মেমোরিয়াল টেকনিক্যাল স্কুল’ যা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। বর্তমানে ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, ড্রাইভিং ও কম্পিউটার-এই চারটি বেসিক ট্রেড কোর্স আছে। ছাত্র, শিক্ষক, ভবন ও যন্ত্রপাতি আছে, আছে মানুষের ভালোবাসা। স্কুলটি এলাকার ভোটকেন্দ্র। এবারই প্রথম ভোট হয়েছে। গ্রামের মানুষ ওই স্কুলে গেছে, ভোট দিয়েছে; আর হয়তো বা আমার মায়ের নাম একবার হলেও স্মরণ করেছে- এটিই আমার পরম পাওয়া। আল্লাহ তুমিই মহান।

tengineers16@gmail.com

এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত নিউজগুলো বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও ব্যবহার করা বেআইনি।
taraftarium24selcuksportsjustin tvcanlı maç izletaraftarium24 güncel adrestaraftarium24