মরণঘাতি করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা বিশ্বের সাথে আমাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে সর্তকতা হিসেবে ১৭ই মার্চে সারাদেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর,শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে মে মাস থেকে অনলাইনে পড়ানোর ব্যবস্থা শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া অনলাইনেই পাশাপাশি সংসদ টেলিভিশন প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্তা করেন শিক্ষামন্ত্রালয়।
কিন্তু শহরে পড়ুয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা গ্রামে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারে থেকে আসা। এমনও অনেক শিক্ষার্থী আছে, যাদের পরিবারের আয়ের উৎস খুবই সামান্য। যারা দিনে এনে দিনে খায়, এমন অবস্থা। এসব শিক্ষার্থীদের মাঝে অনেকেই অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস,নেট সংযোগ বা ডাটা দিয়ে ব্যবহার করার মতো আর্থিক অবস্থানে নেই। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থী শহরাঞ্চলে অবস্থান করছে।তারা তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের কিছুটা সুবিধা পেলেও গ্রাম,চর,হাওর অথবা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বসবাসরতরা উন্নত নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড সুবিধা সহজে পাচ্ছে না।এছাড়া গ্রামে বেশি সংখ্যক পরিবার নিন্ম আয়ের,বর্তমান এ মহামারি পরিস্থিতিতে যে সময়ে লকডাউন ছিলো তারা অন্যদের কাছে ধার দেনা করে চলছে। যেখানে এদের সংসার চালানো মুশকিল হচ্ছে কেউবা লেখাপড়া পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ বহন করতো কিন্তু সেটাও এখন নেই। এর ফলে পরিবারগুলোর ইন্টারনেটের খরচ বহন করা খুব কষ্টসাধ্য। নিন্ম আয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের ভালো মানের মোবাইল,ল্যাপটপ বা কম্পিউটার সুবিধা নেই। কলেজ পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীর নিজস্ব স্মার্ট ফোন নেই পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের ফোন ব্যবহার করে ক্লাস করছে। এমনটা দেখা যায় গ্রাম অঞ্চলে।শুধু তাই নয় যদিও কেউ কেউ ক্লাস করে কিন্তু দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অনলাইনে ক্লাস করার সময় নানান সমস্যায় ভুগছে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে শহরে বেশীরভাগের বাসায় টেলিভিশন দেখা মিললেও গ্রামে কিন্তু তা নয়,সবার কেনার সার্মথ্য নেই যদিও কারো কারো বাড়িতে টেলিভিশন দেখা যায় তারপরেও লোডশেডিং সমস্যা যেন গ্রামের নিত্য দিনের সাথী। ফলে অনেকেই সময় মতো ক্লাস করতেও পারে না। এমনি গ্রামে চর অঞ্চলগুলোতে যেখানে এখনো বিদুৎের ছোঁয়া পৌছাইনি তারাতো অনলাইন ও টেলিভিশন দুটো থেকেই একদম বঞ্চিত। গ্রাম অঞ্চলের নিন্ম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা অনলাইন এবং টেলিভিশন ক্লাসে নানান সমস্যা কারণে পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি অনেকেই মেধাবী হওয়ার সত্বেও শিক্ষার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে মানবিক গ্রুপের একাদশ শ্রেনীর (সেশন ২০১৯-২০২০) শিক্ষার্থী মোঃ মাহতিম হাসিব জানায়, করোনার আগে কলেজ চলাকালীন সময়ে খুবই বাধ্যবাধকতার সাথে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছি। কিন্তু এই লকডাউনের সময়ে পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা সঠিক ভাবে করতে পারছিনা। আমার বাবা মাস খানেক আগে অনলাইন ক্লাস করার জন্য ২৩০০ টাকা দিয়ে একটি স্মার্টফোন কিনে দিয়েছে,টাকার অভাবে আমি ফোনে এমবি কিনতে পারি না। এক বন্ধুর বাসায় ওয়াইফাই আছে যা আমার বাড়ি রশিদপুর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে, তবুও সেই পথ পাড়ি দিয়ে অনলাইন ক্লাস করতে যেতাম। হঠাৎ করে সপ্তাহ খানেক আগে হাত থেকে পরে গিয়ে ফোন অকেজো হয়ছে, সে কারণে অনলাইন ক্লাস করতে পারছি না। আমার পরিবারের পক্ষে নতুন করে স্মার্ট ফোন কিনে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বর্তমানে এখন বন্ধুদের ফোন কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে অনলাইন ক্লাসের ভিডিওগুলো দেখি। আমার মতো গরিব ঘরের শিক্ষার্থীদের হয়তো শিক্ষার আলো গ্রহনের অধিকার নেই, এমনটি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন এ শিক্ষার্থী।
এছাড়া সিলেট পলিটেকনিক এ মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ৬ষ্ঠ পর্বের পড়ুয়া মেধাবী শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দিন বর্তমানে গ্রামে বাড়ি জামালপুরে রয়েছেন। এ বিষয়ে সে জানায়, আমাদের পলিটেকনিক ক্লাসগুলো ফেসবুক পেইজে লাইভ ক্লাস হিসেবে সম্প্রচারিত হয় যা হলো একমুখি ক্লাস ব্যবস্থা। সেখানে সরাসরি শিক্ষক-শিক্ষার্থী একে অপরে কোন সরাসরি মতামত প্রকাশ করার সুযোগ নেই। যদিও আছে সেটা কমেন্ট সিস্টেম,আমার সমস্যা বিষয়ে কমেন্টেও করছিলাম তবুও কোন সাড়া পাইনি। এছাড়া দৈনিক ক্লাসের সংখ্যা অনেক কম। এর ফলে আমি পড়ালেখায় অনেকটাই পিছনে পড়েছি,এর মাঝে পরিক্ষা নিলে ফলাফল মোটেও ভালো হবে না।
গ্রামের শিক্ষার্থীদের তুলনায় শহরে বসবাসকারীরা বহুগুণে এগিয়ে রয়েছে। তবে যদি বছর শেষে পরীক্ষা নেওয়া হয় তাহল তারা কি লিখতে পারবে? যদিও পারে,ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। তারা মেধাবী হওয়ার সত্ত্বেও সুবিধাবঞ্চিত হয়ে ঝরে পড়তে পারে। সরকারের কাছে শহর-গ্রাম সকলের জন্যেই শিক্ষার অধিকার সমান। তাই আমি মনে করি শিক্ষার বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক যেখানে সকলেই সমান মূল্যায়ন পাবে।