বিয়ের আংটি

মর্গের একপাশে একটি পোড়া দেহ যারা দেখছেন তারাই আঁতকে উঠছেন। দেহটা এমন ভাবে পুড়েছে যে লাশ দেখে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে স্বজনদের। ওই সময় মর্গের সামনে ছুটে আসে মিঠুন।

তিন মাস আগে মিথিলাকে বিয়ে করেছে মিঠুন। বিয়ের পর এখনও বাড়ি যাওয়া হয়নি তাদের। কথা ছিল সামনের ছুটিতে দু’জনে মিলে বাড়িতে যাবে।
দীর্ঘ দিনের প্রেমের পর সবার অজান্তে বিয়ে করে মিথিলা ও মিঠুন। মিথিলার পরিবার বিয়ে মেনে নিলেও মিঠুনের পরিবারের তা মানতে বিলম্ব হয়। তাই বিয়ের পর ঢাকার উত্তরায় বাসা ভাড়া নিয়েই দাম্পত্য জীবন শুরু করতে হয় মিথিলা ও মিঠুনের। দু’জনেই চাকুরি করে। মিথিলা একটি পর্যটন কোম্পানিতে আর মিঠুন একটি বিমা কোম্পানিতে। মিথিলার অফিস বনানীর দোয়েল টাওয়ারে আর মিঠুনের অফিস মতিঝিলে। প্রতিদিন দু’জন একসাথে সকালের নাস্তা সেরে বাসা থেকে বের হয়ে ফেরে রাতে। তাই দুপুর ও রাতের খাবার হোটেলেই সারতে হয় দু’জনকে।

একমাত্র মিঠুনকে নিয়ে যে স্বপ্ন এতদিন বাবা-মা দেখে আসছিলেন তাদের ভালোবাসার বলি হয়েছে সেই স্বপ্ন । এই বিষয়টি মিথিলাকে কষ্ট দেয়। অনেক সময় মনের অজান্তেই অশ্রæমেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। মিথিলার মন ছটফট করে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে ক্ষমা চাইতে। মিথিলার ওই ইচ্ছা পূরণ হওয়ার সুযোগ আসে। তিন মাস পর মান ভাঙে মিঠুনের বাবা-মা’র। পুত্রবধূকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে মিঠুনের মোবাইলে কল আসে গত তিন দিন আগে। তারা পুত্রবধূর চরিত্র নিয়ে প্রশংসা শুনেছেন। মিঠুনের এক কলিগ বিমার কাজে বগুড়ায় গেলে মিঠুনের বাবা-মা’কে দেখে আসেন। ওই সময় মিথিলার চারিত্রিক বিষয় নিয়ে কথা উঠলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন মিঠুনের কলিগ। মিথিলার প্রশংসা শুনে পুত্রবধূর প্রতি একধরনের মায়া জন্মে শ্বশুর-শাশুড়ির। মিথিলাকে দেখতে মিঠুনের বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারপর পুত্রবধূকে সঙ্গে করে বাড়ি যেতে ছেলের কাছে মোবাইল ফোনে কল দেয় মা। মা’য়ের এমন ফোনে খুশিতে ভরে ওঠে মিথিলা ও মিঠুনের মন। দু’জনে সিদ্ধান্ত নেয় সামনের ছুটিতে বাড়ি যাবে তারা।

মিথিলা ওর বাবা-মা’য়ের সাথে খুশির সংবাদটি ভাগাভাগি করে। বেয়াই ও বেয়ানকে তারাও দেখতে যাবে বলে ইচ্ছা পোষণ করে। বিষয়টি নিয়ে মিঠুনের সাথেও কথা বলেন মিথিলার বাবা-মা।

আর দু’দিন পরই গ্রীষ্মের একসপ্তাহ লম্বা ছুটি। মিথিলা নিজ হাতে শ্বশুর-শাশুড়ির জন্যে কেনাকাটা করে। মায়ের জন্যে জামদানি শাড়ি আর বাবার জন্যে খদ্দেরের পাঞ্জাবিসহ নানা উপঢৌকন কেনা হয়। মিথিলা কেনাকাটা শেষে মিঠুনকে বলেÑ আমার ইচ্ছে করছে এখনি চলে যাই। বাবা-মা’কে দেখার জন্যে তর সইছে না। মিথিলার মনের আনন্দে মিঠুনও আবেগতাড়িত হয়।

পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে মা’কে ফোন করে বলেÑ আগামী মঙ্গলবার তোমার পুত্রবধূকে নিয়ে বাড়ি আসছি মা। ঘরের পিছনে কলতলার আমগাছটায় নিশ্চই আম ধরেছে ? ওই গাছের পাকা আম আর বাড়ির দক্ষিণে হলুদ-খেতের উপর ঝুলে থাকা কাঁঠালগাছটির পাকা কাঁঠালের কোষ কত দিন খাই না মা। এবার বাড়ি আসলে এসব পাবো তো? পুকুরপাড়ের নারকেল গাছটিতে নিশ্চই ঝুনা নারকেল আছে ? নারকেলের চিড়া তোমার পুত্রবধূর খুবই পছন্দের। ওর নিজ হাতে তোমাদের জন্যে কেনাকাটা করেছে মা ? ও খুব মিষ্টি মেয়ে। ওর কোনো দোষ নেই। আমি ওকে ফুসলিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি। আমাদের ক্ষমা করো মা। বাড়িতে এসে তোমাদের নিয়ে আনন্দ করবো, হৈচৈ করবো। অনেক ভালো লাগবে মা। মিথিলা বলেছে তোমাদের ঢাকায় নিয়ে আসেবে। বাড়িতে একা একা তোমাদের আর কষ্ট করতে দেবে না। এখন মাঝেমধ্যে আমরা হোটেলে খেয়ে ফেলি। ও বলছে তোমরা এলে তিন বেলাই বাসায় রান্না হবে। আর হোটেলে খাব না। মিথিলা রান্নার নানান রেসিপি জানে। ওর হাতের রান্না ঠিক তোমার হাতের রান্নার মতো।

মিঠুনের কথা শেষ না হতেই মোবাইল কেড়ে নেয় মিথিলা। মা’য়ের শরীর-স্বাস্থ্যের খবর নিয়ে বলতে থাকেন মা, ওর কথা বিশ্বাস করবেন না। আপনার ছেলে একটু বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে। আমি তেমন রান্না জানি না । আমার বহুদিনের ইচ্ছে আপনার কাছ থেকে রান্না শিখবো মা।

ছেলে আর পুত্রবধূর এমন ধারার কথায় মায়ের মন জুড়িয়ে যায়। মিঠুনের বাবার সাথে বলে Ñ আমার মিঠুনের পছন্দ ভালো । বলছিলাম না, আমার ছেলে ভুল করতে পারে না। আগামী মঙ্গলবার ওরা বাড়ি আসছে। মেয়েটা নারকেলের চিড়া খেতে পছন্দ করে। আমাকে গাছ থেকে কয়েকটা নারকেল এনে দেন। আমি মেয়েটার জন্য চিড়া করে রাখব।

সোমবার সকাল সকাল অফিসে চলে যায় মিথিলা। মিঠুনও তার সাথে বেরিয়ে পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে। মিথিলা অন্যদিনের মতোই অফিসে বসে দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ লোকজনের চেঁচামেচি শোনা যায় পাশের ব্যালকনিতে। অফিসের লোকজন ‘ভবনে আগুন লেগেছে’ বলে চিৎকার করে ওঠে।

মিথিলা বুঝতে পারেনি তার কী করা উচিত। এতদিনের পরিচিত কলিগরা প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে যার যার মতো ছুটছে। ভবনের ছয়তলা থেকে জানালার গ্রিল বেয়ে নিচে নামছে কেউ কেউ। কেউ আবার পাশে ঝুলন্ত তারে ধরেই নামার চেষ্টা করছে। দেখেতে দেখতে মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা এসে মিথিলার অফিস কক্ষে ঢুকে পড়ে। চারদিকে আটকা পড়ে মিঠুনের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন হ্যালো, শুনছো। আমি মনে হয় বাঁচবো না। আমার অফিসে আগুন লেগেছে। মা-বাবার খেয়াল রেখো… কথাটি শেষ না হতেই আগুনে গ্রাস করে মিথিলাকে।
কল কেটে গেলে মিঠুন বার বার মিথিলার মোবাইলে ফোন করে আর সংযোগ পায়নি। মিঠুন ছুটে আসে বনানীতে। ততক্ষণে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দমকল বাহিনীর লোকজন।
ভবনে আটকাপড়া লোকজনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হাসপাতালে। যারা মারা গেছেন তাদের লাশ মর্গের সামনে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
আহতদের মাঝে যাদের পাওয়া যাচ্ছে না তাদেরকে খোঁজা হচ্ছে মর্গের সামনের ওই সারিতে। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন মিঠুন ও মিথিলার মা-বাবা।
হাসপাতালে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মিথিলাকে পাওয়া যায়নি। অগত্যা মর্গের সামনে গিয়ে মিথিলাকে খোঁজেন স্বজনরা। একে একে যার যার লাশ শনাক্ত করে নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। মিথিলার লাশ এখানেও মিলছে না। মর্গের একপাশে পড়ে থাকা একটি লাশের পাশে গিয়েও ফিরে আসেন। নিজের মেয়ের লাশ শনাক্ত করতে পারেননি মিথিলার বাবা-মা। এমন সময় পাগলের মতো ছুটে এসে সারিবদ্ধ লাশগুলোতে উলটে-পালটে কী যেন খুঁজে ফিরছে মিঠুন। একেবারে মর্গের দক্ষিণ কোনায় পুড়ে অঙ্গার একটি দেহের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় সে। সমস্ত শরীর পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। ডান হাতের অনামিকাআঙুলটি তখনো চিকচিক করছে। আঙুলের দিকে চোখ পড়তেই ঝিলিক দিয়ে ওঠে সোনালী আংটি। আংটিটি দেখা মাত্রই চিৎকার দিয়ে ওঠে মিঠুন। তুমি এভাবে যেতে পারো না মিথিলা। একে একে ছুটে যায় স্বজনরা সব। মিথিলার লাশ ঘিরে শুরু হয় কান্নার রোল। বিয়ের রাতে আংটি-বদলের দৃশ্য ভেসে ওঠে মিঠুনের চোখে। বার বার মূর্ছা যাচ্ছে মিঠুন। পাশে বসে কেঁদে কেঁদে মিঠুনের মা বলছেনÑ তোমার জন্য নারকেল-চিড়া বানিয়েছি তুমি খাবে না মা ? তুমি আমার হাতে, রান্না শিখবে না। আমার মিঠুন এখন কী নিয়ে বাঁচবে।

Share this post

scroll to top