দ্রুত বিচার আদালত ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা

আমাদের দেশে দুই ধরনের আদালত রয়েছে। এর একটি হলো উচ্চ আদালত আর অপরটি অধস্তন আদালত। উচ্চ আদালত বলতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগকে বোঝায়। অপর দিকে অধস্তন আদালত বলতে জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, সহকারী জজ এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতগুলোকে বোঝায়। দেশের জনগণ বিচারকদের কাছে সব সময় ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে এবং সে লক্ষ্য সামনে রেখেই দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৯৪(৪) ও ১১৬ক-তে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ‘প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক এবং বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন।’

দেশের প্রচলিত আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তা অপরাধের ধরন অনুযায়ী সাধারণ বা বিশেষ আদালতে বিচার্য হয়। কোন ধরনের অপরাধ কোন আদালত কর্তৃক বিচার্য হবে এবং কোন ধরনের অপরাধে সাজা বা দণ্ডের পরিমাণ কী হবে, তা সবিস্তারে বিভিন্ন দণ্ড আইনে উল্লেখ রয়েছে।

দ্রুত বিচার আদালত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারীসহ কিছু অপরাধের দ্রুত ও ত্বরিত বিচারের নিমিত্তে ২০০২ সালে গঠিত হয়। তখন আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এ উল্লেখ ছিল, এ আইনটি কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে চার বছর বলবৎ থাকবে। পরে চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বক্ষণে আইনটির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয় এবং এরপর ২০১৪ অবধি তিন দফায় দুই বছর করে বাড়িয়ে সর্বশেষ, ২০১৪ সালে আইনটির মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বর্ধিত করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এ দ্রুত বিচার আদালত গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে- ‘সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রত্যেক জেলায় এবং মেট্রোপলিটন এলাকায় এক বা একাধিক দ্রুত বিচার আদালত গঠন করতে পারবে।’ ওই প্রজ্ঞাপনে প্রতিটি দ্রুত বিচার আদালতের স্থানীয় অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেয়ার কথাও ছিল। আইনটিতে প্রতিটি আদালত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট সমন্বয়ে গঠিত হবে মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এ যেসব অপরাধকে আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ রূপে গণ্য করা হয়েছে তা হলো ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বেআইনি বল প্রয়োগ করে কোনো ব্যক্তি বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা বা আদায়ের চেষ্টা করা; বা স্থলপথ, রেলপথ, জলপথ বা আকাশপথে যানচলাচলে প্রতিবন্ধকতা বা বিঘœ সৃষ্টি; বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো যানবাহনের ক্ষতি সাধন; বা ইচ্ছাকৃতভাবে সরকার বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোনো প্রতিষ্ঠান, বা কোনো ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর যেকোনো প্রকার সম্পত্তি বিনষ্ট বা ভাঙচুর করা; অথবা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো অর্থ, অলঙ্কার, মূল্যবান জিনিসপত্র বা অন্য কোনো বস্তু বা যানবাহন ছিনতাই বা ছিনতাইয়ের চেষ্টা; অথবা কোনো স্থানে, বাড়িঘরে, দোকানপাটে, হাটবাজারে, রাস্তাঘাটে, যানবাহনে বা প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিতভাবে বা আকস্মিকভাবে একক বা দলবদ্ধভাবে শক্তির মহড়া বা দাপট প্রদর্শন করে ভয়ভীতি বা ত্রাস সৃষ্টি; অথবা কোনো সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দরপত্র ক্রয়, বিক্রয়, গ্রহণ বা দাখিলে জোরপূর্বক বাধা প্রদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা; অথবা কোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বা তার কোনো নিকটাত্মীয়কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ওই কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে কোনো কার্য করতে বা না করতে বাধ্য করা।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২-এ বলা হয়েছে সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা সমগ্র দেশের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করবে এবং প্রতিটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত এলাকা নির্দিষ্ট করে দেবে। এ বিষয়ে আইনটিতে আরো উল্লেখ রয়েছে যে, প্রত্যেক দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে একজন করে বিচারক থাকবেন এবং ওই বিচারক বিচারকর্ম বিভাগের জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য হতে নিযুক্ত হবেন।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২-এ মামলা স্থানান্তরের বিষয়ে বলা হয়েছে- ‘সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, জনস্বার্থে হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য এবং মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধের বিচারাধীন কোনো মামলা এর যেকোনো পর্যায় ক্ষেত্রমতো দায়রা আদালত বা বিশেষ আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত হতে বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে পারবে।’

মামলা স্থানান্তর করার বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮- যা সচরাচর সব সাধারণ আইন ও বিশেষ আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়- তাতে উল্লেখ রয়েছে যে, একজন মুখ্য মহানগর হাকিম অথবা মুখ্য বিচারিক হাকিম অথবা একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট যেকোনো মামলা আমলে নেয়ার পূর্ববর্তী তদন্তের জন্য এবং আমলে নেয়ার পরবর্তী বিচারের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্থানান্তর করতে পারবেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতে দায়রা আদালতকে ওই আদালত বরাবরে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক আসামি প্রেরিত না হয়ে থাকলে, আদি অধিক্ষেত্রের আদালত হিসেবে মামলা সরাসরি বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

উপরিউক্ত বিধান ছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে হাইকোর্ট বিভাগের এক বেঞ্চ থেকে অপর বেঞ্চে মামলা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ওই বিভাগের অধীন যেকোনো ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন যেকোনো মামলা প্রত্যাহারপূর্বক নিজ আদালতে বিচার করতে পারবে অথবা অধীনস্থ একটি ফৌজদারি আদালত থেকে অপর ফৌজদারি আদালতে স্থানান্তর করতে পারবে। মামলা প্রত্যাহার ও স্থানান্তর বিষয়ে একজন দায়রা জজকে তার এখতিয়ারাধীন এলাকায় হাইকোর্ট বিভাগের অনুরূপ নিজ আদালতে অধস্তন আদালত থেকে প্রত্যাহারপূর্বক বিচার এবং তার অধীনস্থ এক আদালত থেকে অপর আদালতে স্থানান্তরের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। অনুরূপ ক্ষমতা মুখ্য মহানগর হাকিম, মুখ্য বিচারিক হাকিম এবং একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকেও তাদের অধস্তন আদালতে যে মামলা তারা বিচার বা তদন্তের জন্য প্রেরণ করে থাকেন, ওই মামলার বিষয়ে দেয়া হয়েছে।

দায়রা জজের আদালত এবং দায়রা জজের সমমর্যাদাসম্পন্ন আদালতগুলোতে রাষ্ট্রের পক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মামলা পরিচালনা করে থাকেন। যেকোনো মামলা ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন থাকাকালে পাবলিক প্রসিকিউটর একজন আসামি বা সব আসামির বিষয়ে সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে মামলা থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমোদনের আবশ্যকতা রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ পর্যালোচনায় দেখা যায়, দ্রুত বিচার আদালত নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রমের আগেই পুনঃপুন সময়সীমা বর্ধিত করার কারণে এ আইন সংশ্লেষে প্রতিষ্ঠিত আদালত ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস অবধি কার্যকর থাকবে, যদি ২০১৯ এপ্রিলের আগে পুনঃবর্ধিত করা না হয়। অপর দিকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কোনো সময়সীমা বেঁধে না দিয়ে প্রতিষ্ঠা করায় এ আইনটি যত দিন বলবৎ থাকবে, তত দিন এ আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোও কার্যকর থাকবে।

আমাদের দেশের বিভিন্ন সাধারণ ও বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাধারণ আদালতের ক্ষেত্রে কখনো সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় না। বিশেষ আদালতের ক্ষেত্রে যদিও দু-একটির ক্ষেত্রে সময়সীমা বেঁধে দেয়ার নজির আছে, কিন্তু দ্রুত বিচার আদালতকে যে ধরনের মামলার বিচারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সময়সীমা বেঁধে দেয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

দ্রুত বিচার আদালত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করা হয় তার বেশির ভাগের পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে, তা বিভিন্ন মামলায় প্রদত্ত সাজা এবং সাজা-পরবর্তী আপিল মামলা বিচারাধীন অবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমাবিষয়ক সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগ থেকে অনুধাবন করা যায়।

দ্রুত বিচার আদালত মামলা প্রত্যাহার ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলির অনুসরণ করে থাকলেও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল তা করে না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি মামলা প্রত্যাহার ও স্থানান্তর করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

একজন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক যেকোনো ফৌজদারি মামলা আমলে নেয়ার পূর্ববর্তী তদন্তের জন্য অপর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রেরণ অথবা আমলে নেয়ার পরবর্তী বিচারের জন্য স্থানান্তর করা একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত। একজন ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের এ বিচারিক সিদ্ধান্তটি যদি প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, সে ক্ষেত্রে একজন বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেটকে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনায় যে ক্ষমতা বা অধিকার দিয়েছে, তার ওপর এটি হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২-এ মামলা স্থানান্তর বিষয়ে সরকারকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সরকারের এ ক্ষমতার সাথে ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার ও উত্তোলন বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনস্থ বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এর পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, স্থানান্তরবিষয়ক সরকারের ক্ষমতাটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী এবং সমভাবে সংবিধানস্বীকৃত বিচারকদের স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেতনাবিরোধী। এ বাস্তবতায় প্রথমোক্ত আইনটির বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিধান এবং শেষোক্ত আইনটির বিষয়ে সরকারের মামলা স্থানান্তর-সংক্রান্ত ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংবিধানের বিধানাবলির আলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলে আইন দু’টির অন্তর্নিহিত ত্রুটির অবসান ঘটবে- এমনটিই প্রতিভাত হয়।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top