1. kaium.hrd@gmail.com : ময়মনসিংহ লাইভ ডেস্ক : ময়মনসিংহ লাইভ ডেস্ক
নেত্রকোনায় দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি : শঙ্কায় খাদ্য সংকট
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

নেত্রকোনায় দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি : শঙ্কায় খাদ্য সংকট

আলপনা বেগম
  • আপডেট সময় : শুক্রবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৩
Alpona Begumn

সেই ব্রিটিশ আমল থেকে যুগে যুগে কৃষি জমি রক্ষা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চললেও থেমে নেই কৃষি জমির অপব্যবহার। মানবসভ্যতার শুরু হয় এই কৃষি জমি থেকেই। বিশেষজ্ঞদের মতেও কৃষি জমির সঙ্কট একটি প্রাগৈতিহাসিক ব্যাপার। সময়ে সময়ে কৃষকদের লড়াইয়ের দিক পরিবর্তন হয় মাত্র।

এক সময় পাহাড় জঙ্গল পরিস্কার করে কৃষকরা ভূমিকে কৃষি উপযোগী করে তুললেও কালের বিবর্তণে মানুষ বাড়ার সাথে সাথে আবার কমছে। প্রভাব পড়ছে এই কৃষি জমির উপরই। এভাবে বিবর্তণ ঘটলেও আলাদা করে কৃষি জমি নিয়ে বিশদ কোন পরিকল্পনা হতে দেখা যায় না তেমন। পাহাড় এবং হাওর ঘেরা নেত্রকোনা জেলাকে প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের ভান্ডার বলে বিবেচিত হয়। হাওরাঞ্চল মানেই মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী তিনটি উপজেলা।

এছাড়াও রয়েছে কলমাকন্দার বেশ কিছু অংশ এবং আটপাড়া, কেন্দুয়ার আংশিক অংশ। যেগুলো ধান এবং মৎস্য সম্পদের ভান্ডার বলে পরিচিত। কৃষির উপজীব্য পুরো জেলার মধ্যেও বেশির ভাগ ধরা হয় হাওরাঞ্চলকে। কিন্তু দিনে দিনে কৃষি উপজীব্য ভূমির পরিমাণ কমতির দিকে রয়েছে।

স্থানীয় এবং গবেষকদের তথ্য থেকে উঠে আসা কারণগুলোর মধ্যে মোটাদাগে বললে দেখা যায়, ঘরবাড়ি তৈরী, ইটভাটা তৈরী এবং ইটের ভাটায় টপসয়েল বিক্রি, শিল্পকারখানা স্থাপন, কৃষি জমি কেটে ফিসারি, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মান, অপপ্রয়োজনীয় হাটবাজার স্থাপন, ঘরবাড়ি স্তাপনার জন্য জলাশয় ভরাট, বনভূমি বিলুপ্তি, বিভিন্ন টাওয়ার নির্মাণ করে জমির বিভাজনসহ পাহাড়ি বালিতে নষ্ট হচ্ছে কৃষি জমি। এদিকে মানুষ বাড়ার সাথে সাথে এসব স্থাপনাসহ কৃষি জমি দখলের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু পরিকল্পনা ছাড়াই কৃষি উপজীব্য জমির অপব্যবহার করায় দিনে দিনে খাদ্য ঘাটতিতে পড়তে হবে। খাদ্য উৎপাদনে জনজীবনে সমস্যা সৃষ্টি হবে। এরই মধ্যে কমে যাচ্ছে গো-চারণ ভূমিও। এটাও কৃষির উপরই চাপ পড়ছে। খাদ্য উৎপাদন কমলে আমদানী কমবে। জলাভূমিতে হাজার হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হলেও এখন এই মাছের এবং মাছের সাথে জড়িত পেশার শ্রমিক কমছে। এর ফলেও কৃষিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

নদী নিয়ে গবেষণাকারী শংকর জানান, শুধুমাত্র নেত্রকোনার মগড়া নদীকে ঘিরে ৫৭৬ টি জেলে পরিবার ছিলো। যাদের সকলেই এখন পেশা হারিয়ে বিপন্ন অবস্থায় আছে।

নেত্রকোনার কৃষি জমি নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, পাহাড়ি সোমেশ্বরী বা কংশ নদী দিয়ে বালু আসা এর একটি কারণ। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল নামে দুটি উপজেলা দিয়েই। আর এই ঢলে ডুবে যায় হাওরাঞ্চল সহ জেলার বিস্তর ফসলি জমি। তখন ভেসে আসা বালি থেকে যায় সেসকল কৃষি উপজীব্য ভূমিতে। এদিকে জলাভূমিও এই একই কারণে ভরাট হয়। এর সাথে থাকে দখল দূষণ আছেই। এভাবেই দিনে দিনে কৃষিজমিসহ জলাভূমির উপর নানা ধরনের দুর্যোগের প্রভাব রয়েছে। আরও রয়েছে প্রতিবছর হারাঞ্চলের একমাত্র ফসল বোরো ধান রক্ষার নামে বেরিবাঁধ কর্মসূচী। যেটি সম্পূর্ন অপরিকল্পিত কৃষি জমি খেকো একটি কর্মসূচী।

স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাটি কেটে এসকল বেরিবাঁধ করা হয়। কিন্তু এই মাটিগুলো এমনিতেই পানিতে তলিয়ে যায়। যেগুলো আর সরানো হয়না অথবা সরানোর সুযোগ থাকে না। ফলে পুরো কৃষি জমি ভরাট হতে থাকে এবং জলাভূমিতে প্রলেপ পড়তে থাকে। এর ফলে বিভিন্ন নদী খাল বিল জলাশয়গুলোর গভীরতা কমে যায়।

আবার পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ত্রাণ পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উদ্যোগে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হাওর গুলোতে ভক্স কালর্ভার্ট বা সুইসগেটগুলোও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। কয়েক যুগ পূর্বে নির্মিত এগুলোর তদারকি না থাকায় সময় মতো পানি চলাচল না হওয়ায় অনেক সময় নীচু জমি চাষ হয়না। আবার দেরিতে চাষ করলে পরবর্তীতে বন্যার কবলে পড়ে। এসব জটিলতায় কৃষকরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। প্রায় একই অবস্থা মৎস্য সম্পদেরও।

যে কারণে গবেষকরা জানান, হাওরে বেরিবাঁধের কর্মসূচী বাতিল করে সময় মতো স্বল্প জীবন কালীন কৃষি ফসল ফলানোর জন্য অগ্রণী ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন। তারা বলেন নিয়ম অনুযায়ীই বৈশাখ মাসে বোরো ফসল ওঠে। সেইসাথে বৈশাখ মাসে হাওরে পানি আসতে আসতে ধান কেটে ফেলা যায়। সুতরাং অযাচিত বাঁধ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তার উপর নদী এবং নানা ধরনের জলাশয়গুলো সঠিক নিয়মে দখলমুক্ত করে সেগুলো খনন করলেও পানির ধারণ ক্ষমতা ফিরে আসবে। ফলে ওভার ফ্লু হবার সম্ভাবনা কমে আসবে। প্রতিবছর অযাচিত মাটি ফেলে দেশের অর্থ নষ্ট হবে না।

হাওরের কৃষি জমির বুক চিরে সড়ক নির্মাণ হয়। কিন্তু পরিকল্পনা করে কৃষি জমির পাশের ড্রেজেন ব্যবস্থাকে ধরে ড্রেন কাম সড়ক করা হয় তাহলে সড়কও হবে কৃষি জমিও বাঁচবে। জমি গুলো বিভাজন হবে না। এদিকে ইটের ভাটা সহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বিশেষ করে ইটের ভাটায় চলে যাচ্ছে সিংহভাগ কৃষি উপজীব্য জমি। আর এ সকল ভাটাগুলোতে যাচ্ছে জমির উপরের মাটি (টপসয়েল)। যার জন্য জমির উর্বরতা হারাচ্ছে। ফলন হচ্ছে কম। ফলে অনাগ্রহ হচ্ছে কৃষক। ফলে দিনে দিনে খাদ্য উৎপাদন কমে আসছে ।

নেত্রকোনার পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জেলায় ৫৩ টির মতো ইটের ভাটা রয়েছে। তারমধ্যে মাত্র ৫ টির ছাড়পত্র রয়েছে। এছাড়াও বেশ কটি বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি অনেকগুলো এমনিতেই অকেজো পড়ে আছে। কিন্তু জমি দখল রয়েই গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, জেলায় ৮ হাজার ৮২৫ হেক্টর অনাবাদী জমি রয়েছে। তারমধ্যে গত রবি মৌওসুমে ১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমি আবাদের আওতায় আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় অনাবাদী জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই কৃষক ভাইদেরকে উদ্বুদ্ধ করে হাওরের চর এলাকাতেও বাদাম, ভুট্টাসহ রবিশস্য চাষসহ বিভিন্ন চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী কোন তিন ফসলি জমিতে স্থাপনা করতে দেয়া হয় না। এটি সম্পুর্ন নিষেধ। তবে অবকাঠামো প্রয়োজন হলে এক ফসলি জমিগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে যায়।

আলপনা বেগম: লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

এই বিভাগের আরও সংবাদ
Mymensingh-IT-Park-Advert
Advert-370
Advert mymensingh live
©MymensinghLive
প্রযুক্তি সহায়তা: ময়মনসিংহ আইটি পার্ক