ঠিকাদারের ব্যর্থতায় উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত

দেশী-বিদেশী ঠিকাদারের কাছে সরকারের কিছু কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা প্রকল্প জিম্মি হয়ে আছে। ঠিকাদারের ব্যর্থতার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও সময়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৭০ শতাংশ অর্থ অগ্রিম পরিশোধ করা হলেও দেড় বছরে পণ্য দেয়ার কথা ছিল কিন্তু তিন বছরেও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে জাহাজ সরবরাহ করতে পারেনি।

অন্য দিকে প্রকল্পের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানো হচ্ছে। ব্যয় বাড়ল ১৯৬ দশমিক ৯২ শতাংশ বা দুই হাজার ২২২ কোটি টাকা। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট দুই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর এক হাজার ১২৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার কথা ছিল।

প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করার জন্য সাত প্রকল্প থেকে ব্যয় কমিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার কারণে সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব ব্যয় বাড়ানোর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। দুই হাজার ২২২ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে এই প্রকল্পে।

আর সময় বাড়িয়ে ২০২০ সালে জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ৫১ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। বর্ধিত সময়েও গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হলো ৫৭.৩১ শতাংশ। আর অর্থ ব্যয় হয়েছে একই সময় পর্যন্ত ২ হাজার ২৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ স্টিয়ারিং কমিটির সভাকে জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় বন্দরের সাথে চারটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে সাতটি জাহাজ নির্মাণকাজের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। আর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, ডাকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংস ওয়ার্ক, খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড, আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড, নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড। বর্তমানে জাহাজগুলোর নির্মাণকাজ চলমান আছে। এ পর্যন্ত সব ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চুক্তিমূল্যের ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

বয়া লেইং ভেইসেল সরবরাহের জন্য গত ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেডের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরে ১৮ মাস বা ২০১৮ সালের এপ্রিলের মধ্যে জাহাজ সরবরাহ করার কথা। কিন্তু আনন্দ চার দফায় সেই সময় বাড়িয়েছে ১৭ মাস।

বর্তমানে ঠিকাদার কর্তৃক জাহাজের হাল নির্মাণ এবং অধিকাংশ মেশিনারিজ স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করে জাহাজটি লঞ্চিং করা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে জাহাজটি বুঝিয়ে দেয়া হবে বলে আনন্দ শিপইয়ার্ড প্রতিমন্ত্রীকেও জানান। তাদের কাজের মূল্য ছিল ৩৪ কোটি ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৮২৬ টাকা।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বলছে, বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধায় আমদানিকৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দ্বারা জাহাজটি প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে উক্ত যন্ত্রাংশগুলোর এক্স-বন্ড সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অফারকৃত মূল্যের বিল পরিশোধ না করা হলে এক্সবন্ড সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। পাবকের কাছে জাহাজটির হস্তান্তর রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হবে না। তাই আনন্দ শিপইয়ার্ডের পক্ষে জাহাজটি সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম প্রধান বলছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই আমদানি ঋণপত্র বা এলসি না খোলার কারণে চুক্তিপত্র সংশোধন করে অফারকৃত ডলার এবং টাকায় বিল পরিশোধ সম্ভব নয়। তাই সম্পাদনকৃত চুক্তি অনুযায়ী বিল পরিশোধের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইতঃপূর্বে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া জাহাজটির সরবরাহের সময়সীমা ইতোমধ্যে ১৭ মাস বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাহাজ সরবরাহ করা না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, টাগবোট নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের সাথে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৮ মাসের মধ্যে জাহাজ দেয়ার কথা। পরবর্তীতে তারা আবেদন করে তিন দফায় ১২ মাস বা এক বছর সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়। কাজ সমাপ্তির সময়সীমা ২০১৯ সালের মার্চের ৭ তারিখ শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জাহাজ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। টাগ বোটটির সরবরাহ করার সময় আরো বাড়তি সাত মাস অতিক্রম করেছে। এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাহাজ সরবরাহ না করায় নিউ ওয়েস্টার্ন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বলছে, জমির মূল্যের সাথে ঘরবাড়ি-দালানের দাম, গাছপালার দাম, পুকুর খনন, মৎস্য ও মালিকের উপার্জনের ক্ষতিপূরণ বাবদ ও অন্যান্য ব্যয় বাড়ছে, যা আগের দাম উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) যোগ করা হয়নি। এ ছাড়া মূল ডিপিপি তৈরির সময় শুধু মৌজা দরের ভিত্তিতে জমির ক্ষতিপূরণ ধরা হয়, যা বর্তমানে কয়েকগুণ বেড়েছে। বাড়তি এই ব্যয়গুলো পুনর্গঠিত আরডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার তারিকুল ইসলামের সাথে তার সেলফোনে যোগাযোগ করে ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় তাদের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর একটি জাহাজ পানিতে নামানোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। এটাকে প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু বলা যায়। তবে জাহাজটি পায়রা বন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগবে।

নিউ ওয়েস্টার্ন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের মতামত জানতে চেয়েও কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আবুদস সামাদের সাথে গতকাল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, চুক্তির চেয়েও বেশি সময় বাড়িয়েও তারা পায়রাকে জাহাজ সরবরাহ করতে পারেনি। তারা বলছে তাদের কাজ শেষ পর্যায়ে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে তাদের চিঠি দেয়ার জন্য। ঠিকাদার যথাসময়ে জাহাজ সরবরাহ না করলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কোনো অবস্থাতেই জাহাজ সরবরাহের ক্ষেত্রে অযাচিত বিলম্ব বিবেচনা করা হবে না বলেও স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সচিব জানান, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স যে ধরনের প্রত্যাশা করেছিলাম, তা আমরা তাদের কাছ থেকে পাইনি। সূত্র: নয়া দিগন্ত

sadman travels
error: প্রিয়জন; আপনি লেখা কপি করতে চাচ্ছেন!! অনুগ্রহ করে তা থেকে বিরত থাকুন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Facebook