ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার জীবাণুতে নতুন হুমকি

দেশের দুই কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ওপর বাংলাদেশের প্রতিবেশী একটি দেশের ওষুধে অকার্যকর ম্যালেরিয়া জীবাণুযুক্ত মশা বাংলাদেশের জন্য নতুন করে হুমকি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০ রোহিঙ্গার মধ্যেও পাওয়া গেছে ওষুধে অকার্যকর (রিজিস্ট্যান্ট) ম্যালেরিয়ার জীবাণু। এখান থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেকোনো সময় ওষুধে অকার্যকর ম্যালেরিয়ার জীবাণুযুক্ত মশা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এখনই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পক্ষে ম্যালেরিয়াজনিত হুমকি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

শুধু মিয়ানমারে নয়, বাংলাদেশের প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও রয়েছে সর্বশেষ আবিষ্কৃৃত ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার জীবাণু। থাইল্যান্ডের সাথে রয়েছে বাংলাদেশের নিবিড় যোগাযোগ। পর্যটন ও ব্যবসায়িকভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় গন্তব্যের একটি হলো থাইল্যান্ড। আবার মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়েই ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার মশা চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট গবেষক, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ।

তিনি জানান, গ্রেটার মেকং সাব রিজিয়নের (জিএমএস নামে পরিচিত) পাঁচ দেশের মধ্যে কম্বোডিয়া এমন একটি দেশ যেখানে সব জীবাণু দ্রুত ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে যায় যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার ওষুধ দোকানে পাওয়া না গেলেও কম্বোডিয়ায় যত্রতত্র পাওয়া যায়। ওখানকার মানুষ নিজেরাই ওষুধ কিনে খায়। এভাবে ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং কোর্স সম্পূর্ণ না করায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ আরটিমিসিনিন অকার্যকর হয়ে গেছে। জিএমএস দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ছাড়াও ভিয়েতনাম ও লাও রয়েছে। ভিয়েতনাম ও লাওসের মধ্যেও রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার জীবাণু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ‘বাংলাদেশেও ম্যালেরিয়ার ওষুধ আরটিমিসিনিন প্রতিরোধী পাওয়া গেছে। সংস্থাটি বলছে, মলিক্যুলার টেস্টে বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের অবস্থা একই রকম। মেকং নদীর তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়াতে ম্যালেরিয়ার সর্বশেষ ওষুধ আরটিমিসিনিন সবচেয়ে বেশি অকার্যকর হয়ে গেছে। এর বাইরে কম্বোডিয়ার পাশের দেশ ভিয়েতনামেও ম্যালেরিয়ার জীবাণু আরটিমিসিনিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ‘মিয়ানমারে ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম আরটিমিসিনিন প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ১০ শতাংশ কিন্তু মিয়ানমারের প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে এর পরিমাণ ৯৩ শতাংশ।’ উল্লেখ্য প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম ও প্লাজমোডিয়াম ভাইভেক্স ম্যালেরিয়া জীবাণুর দু’টি প্রজাতি। এশিয়ায় এই দু’টি প্রজাতির ম্যালেরিয়া সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে মানুষকে। বাংলাদেশে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম প্রজাতির মাধ্যমে মানুষ সবচেয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ম্যালেরিয়ার পুরনো ওষুধ ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ববিদ ডা: মো: মশিকুর রহমান বিটু জানান, বাংলাদেশে ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী হয়ে গেছে কিন্তু আরটিমিসিনিন এখনো প্রতিরোধী হয়নি। তবে আরটিমিসিনিনের প্রতিরোধী হয়ে ওঠার কিছু কিছু আলামত দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা অনেক দিন থেকে বাংলাদেশে আছে। আবার ২০১৭ সালে আরো সাত লাখ রোহিঙ্গা চলে এসেছে। মিয়ানমারে আরটিমিসিনিন প্রতিরোধী হয়েছে এমন তথ্য রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই আরটিমিসিনিনের প্রতিরোধী ওঠার তথ্য জানিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে বলে রোগতত্ত্ববিদ ডা: মশিকুর রহমান বিটু জানান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ১৩ জেলার প্রায় দুই কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে পার্বত্য তিন জেলা এবং কক্সবাজারের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুুঁকিপুর্ণ।

ডা. মশিকুর রহমান বিটু জানান, দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের কাছাকাছি থাকলেও পার্বত্য তিন জেলায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পাহাড়িরা বেশি আক্রান্ত হলেও মরছে বেশি সমতলের মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পার্বত্য তিন জেলার পাহাড়িরা সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেও ওষুধে এরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যায় কিন্তু সমতলের মানুষ আক্রান্ত হলে এরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এদের মধ্যে মৃত্যুর হারও বেশি। রাঙ্গামাটি জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৬ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ১৭ জন মারা গেছে। মৃতদের মধ্যে পাহাড়িদের সংখ্যা পাঁচ এবং অবশিষ্টরা ছিল সমতলের মানুষ।

error: প্রিয়জন; আপনি লেখা কপি করতে চাচ্ছেন!! অনুগ্রহ করে তা থেকে বিরত থাকুন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Facebook