এইডস প্রতিরোধে যা প্রয়োজন

অবৈধ যৌনকর্ম, ধর্ষণ, অনৈতিক ও বিকৃত যৌনসম্পর্কের মতো অমানবিক কার্যকলাপ থেকে এইচআইভি/এইডস বিস্তার লাভ করে থাকে। ইউনিসেফের ভাষ্যানুযায়ী, এইচআইভি এমন একটি ভয়াবহ ভাইরাস যেটা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয় এবং জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে মানবদেহকে প্রতিরোধহীন করে নিরাময়হীন অবস্থায় নিয়ে যায়, যা ‘এইডস’ নামে পরিচিত। এটা অবশ্য ছোঁয়াচে রোগ নয়। একমাত্র অনিরাপদ দৈহিক মিলনে এটা সংক্রমিত হতে পারে।

অর্থাৎ, চরিত্রবান মানুষের এইডস হয় না। ‘বহুগামী’ ও দুশ্চরিত্র বা লম্পট মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে রক্ত বা অঙ্গ নিয়ে সুস্থ দেহে ঢোকালে বা প্রতিস্থাপন করলে সুস্থ ব্যক্তি এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে পড়বে। ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে যারা মাদক নেয়, তারা যদি একই সুচ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করে এবং তাদের মধ্যে যেকোনো একজন যদি এইডস আক্রান্ত থাকে, তাহলে প্রত্যেকেই এই মারাত্মক রোগের শিকার হবে। আজ পর্যন্ত এইডস/এইচআইভির কোনো প্রতিষেধক বা কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। নিশ্চিত মৃত্যুই এই রোগের অনিবার্য পরিণতি।

ওরাল সেক্স ও কনডম ব্যবহার করলেও এইডস ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এইচআইভি আক্রান্তরা অল্প বয়সে মারা যায় (বিবিসি নিউজ বাংলা, ২৮ নভেম্বর, ২০১৮)। বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার লোক এতে আক্রান্ত হচ্ছে। এদের প্রায় ৯০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাস করে। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন শিশু যার বয়স ১৫ বছরের কম। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি মহিলা আর অর্ধেকেরও বেশি মহিলার বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে (ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অর্গানাইজেশন অ্যান্ড জয়েন্ট ইউনাইটেড নেশনস প্রোগ্রাম অন এইচআইভি/এইডস)।

২০১৭ সাল পর্যন্ত ‘এইডস’এ আক্রান্ত হয়ে গোটা দুনিয়ায় তিন কোটি ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এইচআইভিতে আক্রান্ত তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছিল সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এইডসে আক্রান্ত ১১ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে মারা গেছে এক হাজার ২২ জন। দেশে প্রায় ছয় হাজার ৪৫৫ ব্যক্তি এইচআইভির জীবাণু বহন করছে।

বাংলাদেশে যাদের দেহে এইচআইভি পাওয়া গেছে, তাদের ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে ফিরে আসা শ্রমিক বা তাদের স্ত্রী। মূলত অবৈধ যৌন মিলনের মাধ্যমে তারা সংক্রমিত। বাংলাদেশে এইডস এখনো ততটা বিস্তার লাভ করেনি, যতটা আশপাশের কয়েকটি দেশে ঘটেছে। তবে এইডস বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্তই এদেশে বিদ্যমান। তাই যেকোনো মুহূর্তে তা বিপজ্জনক মাত্রা পেতে পারে। এইডস থেকে বাঁচার পথ পবিত্র জীবনধারা, নৈতিকতা, শুদ্ধাচার, তাকওয়া ও ধর্মীয় বিধি বিধানের অনুশীলন। এইচআইভি সংক্রমণের কারণ জেনে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ প্রতিরোধক ব্যবস্থা হতে পারে।

অশ্লীলতা, জেনা, ব্যভিচার ও সমকামিতা থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবী সা: বলেন, ‘আমার উম্মতের ব্যাপারে যেটা সবচেয়ে বড় ভয় করি, তা হলো লুত সম্প্রদায়ের অনুরূপ পাপাচার। আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক কওমে লুতের অপকর্মে লিপ্ত হবে। যখন এরূপ হতে দেখবে তখন তাদের ওপরও অনুরূপ আজাব আসার জন্য অপেক্ষা করো।’ লুত সম্প্রদায়ের মতো যারা সমকামিতার জঘন্য পাপে লিপ্ত হবে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। সমকামিতার কারণে লোকালয়কে মহান আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে বিধ্বস্ত করে দিয়েছেন। ঘটনাটি প্রায় ছয় হাজার বছর আগের। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানটি মধ্যপ্রাচ্যের জর্দান ও ইসরাইলের মধ্যখানে অবস্থিত। আরবিতে স্থানটিকে ‘বাহরুল মায়্যিত’ এবং ইংরেজিতে Dead Sea এবং বাংলাতে ‘মৃত সাগর’ বলা হয়। এটি মূলত একটি হ্রদ। সমকামিতার কারণে শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তায়ালা এ জনপদের চার লাখ জনগোষ্ঠীকে বাস্তুভিটাসহ বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন।

দৃষ্টি অবনত রাখা ও যৌনাঙ্গ সংযত রাখার নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কুরআনে। দৃষ্টিকে এমন বস্তু থেকে ফিরিয়ে নিতে হবে যার প্রতি দেখা শরিয়াহতে নিষিদ্ধ ও অবৈধ (সূরা আন নূর : ৩০-৩১)। কারো গোপন তথ্য জানার জন্য তার গৃহে উঁকি মারা এবং যেসব কাজে দৃষ্টি ব্যবহার করা শরিয়াহতে নিষিদ্ধ, সেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। যৌনাঙ্গ সংযত রাখার অর্থ এই যে, কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার যত পন্থা আছে, সবগুলো থেকে নিজেকে সংযত রাখা। আয়াতের উদ্দেশ্য অবৈধ ও হারাম পন্থায় কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ না করা এবং তার সব ভূমিকাকে নিষিদ্ধ করা।

মহানবী সা: বলেন, কুদৃষ্টি শয়তানের একটি তীর, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করবে আল্লাহ তাকে মজবুত ঈমান দিয়ে দেবেন। ফলে সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে। যে চোখ আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে, সে চোখকে কোনো দিন জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারে না। যখন কোনো বান্দা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তর থেকে ঈমান বের হয়ে যায় এবং তার মাথার ওপর ছাতার মতো অবস্থানে থাকে; অতঃপর যখন সে এই অপকর্ম থেকে বিরত হয়, তখন ঈমান তার কাছে প্রত্যাবর্তন করে।

অশ্লীল কাজের ধারেকাছেও না যাওয়ার জন্য ইসলামের রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি। পাপাচার কেবল নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং যেসব বিষয় ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ করে, তৎসমুদয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ইসলাম ধর্মে এগুলো গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। অপরাধ যেমন ঘৃণ্য, শাস্তিও তদ্রƒপ কঠিন ও কঠোর।

মহানবী সা: বলেন, ‘যে জাতির মধ্যে ব্যভিচার ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করবে, সে জাতি দুর্ভিক্ষ ও অভাব-অনটনে পতিত হবে এবং তাদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এই উম্মাহ’র শেষ দিকে ভূমিধস, আকৃতি পরিবর্তন, প্রবল বর্ষণ হবে। হজরত আয়েশা রা: বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে নেককার লোক থাকা অবস্থায়ও কী আমরা ধ্বংস হবো?’ রাসূল সা: বলেন, হ্যাঁ, যখন অশ্লীলতা ও অন্যায় প্রকাশ পাবে।

পবিত্র বাইবেলও বিয়েবহির্ভূত যৌনসম্পর্ককে নিষেধ করে, স্বামী স্ত্রীকে একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার পরামর্শ দেয় এবং আরো বলে যে, খ্রিষ্টানদের কেবল সেই খ্রিষ্টানদেরই বিয়ে করা উচিত যারা বাইবেলের নীতি অনুযায়ী জীবনযাপন করে (১ করিন্থীয় ৭:৩৯; ইব্রীয় ১৩:৪)। এছাড়াও এটা সবরকম নেশাকর দ্রব্যের অপব্যবহার এবং রক্ত নেয়াকে নিষেধ করে। কারণ এই বিষয়গুলো দেহের ক্ষতি করে থাকে (প্রেরিত ১৫:২০; ২ করিন্থীয় ৭:১.;)

এক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এনে সচেতনতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। আল্লাহর কাছে তওবা করে যদি আমরা সৎপথে ফিরে আসি এবং ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলি, তাহলে এইচআইভি/এইডসের মরণ ছোবল থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব। ইসলাম ধর্মে কুস্বভাব বর্জন করে সৎস্বভাব অর্জনের জন্য জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। পাপ বর্জন না করলে শাস্তি ভোগ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। মনে রাখতে হবে, বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী ১০টি রোগের মধ্যে এইডস একটি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম।

sadman travels
error: প্রিয়জন; আপনি লেখা কপি করতে চাচ্ছেন!! অনুগ্রহ করে তা থেকে বিরত থাকুন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Facebook